চিন্তা করুন তো, নিজের একটা ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হওয়াটা কতটা স্বপ্নের মতো লাগে! কিন্তু এই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পর যে বিষয়টা আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়, সেটা হলো প্রতি মাসের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আর নানারকম ট্যাক্স। “আরে বাবা, এই ফ্ল্যাটের ভাড়া, সার্ভিস চার্জ, তার উপর আবার ট্যাক্স!
মাথা ঘুরে যায় আমার তো!” এমন কথা প্রায়ই আমাদের কানে আসে। শুধু আমি নই, আমার পরিচিত অনেক ফ্ল্যাট মালিক বন্ধুরাও এই একই সমস্যার মধ্যে আছেন। বিশেষ করে আজকাল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই খরচগুলো যেন কাঁটা হয়ে বিঁধে।তবে কি জানেন?
এই খরচগুলো কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এর মধ্যে যেমন বিল্ডিংয়ের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, লিফট মেরামত, পানির বিল, তেমনি আবাসন সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট ট্যাক্সও যুক্ত থাকে। অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না কোন খাতে কত টাকা যাচ্ছে, বা কিভাবে এই খরচগুলো কমানো যায়। সম্প্রতি, সরকার এবং আবাসন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কিছু নতুন নিয়ম এবং সুযোগ এসেছে, যা এই বিষয়গুলোকে আরও স্বচ্ছ করে তুলছে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, যদি আমরা একটু বুদ্ধি খাটিয়ে চলি আর সঠিক তথ্য জেনে রাখি, তাহলে এই বোঝা অনেকটাই হালকা করা সম্ভব। এখন আর অহেতুক দুশ্চিন্তা করার দিন নেই, কারণ সঠিক পরিকল্পনা আর কিছু কার্যকর টিপস আপনার ফ্ল্যাট জীবনকে আরও আনন্দময় করে তুলতে পারে।তাহলে আর দেরি কেন?
চলুন, এই জটিল ধাঁধার সমাধান করে ফেলি!
নিজের ফ্ল্যাটে থাকার আনন্দটাই অন্যরকম, তাই না? কিন্তু সেই আনন্দের সাথে যেন একটা সূক্ষ্ম দুশ্চিন্তাও জুড়ে থাকে, সেটা হলো ফ্ল্যাটের খরচ আর ট্যাক্সের বোঝা। আমি জানি, আমার মতো আপনারও হয়তো মাঝেমধ্যে মনে হয়, “ধুর বাবা! এত কিছু সামলাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট ফাঁকা!” সত্যি বলতে, এই সমস্যাটা শুধু আমাদের একার নয়। তবে সম্প্রতি কিছু নতুন নিয়মকানুন এসেছে, আর কিছু কৌশল যদি আমরা একটু জেনে নিই, তাহলে এই খরচগুলো কমানো কিন্তু অসম্ভব নয়। আজ আমি আমার অভিজ্ঞতা আর সাম্প্রতিক তথ্যগুলো আপনাদের সাথে ভাগ করে নেব, যাতে আপনাদের ফ্ল্যাট জীবনটা আরও সহজ আর সুন্দর হয়।
ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণ: শুধু খরচ নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

মাসিক সার্ভিস চার্জ: কোন খাতে কত যাচ্ছে?
আমাদের ফ্ল্যাটে মাসিক যে সার্ভিস চার্জগুলো দিতে হয়, সেগুলো কিন্তু শুধু একটি অঙ্ক নয়, এর পেছনে অনেকগুলো জরুরি সেবা জড়িয়ে আছে। যেমন ধরুন, লিফট রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বেতন, ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী, কমন এরিয়ার বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল – এই সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় আমাদের মাসিক সার্ভিস চার্জ। আমি নিজে দেখেছি, অনেক সময় আমরা জানিই না কোন খাতে কত টাকা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, “দোস্ত, আমাদের বিল্ডিংয়ের লিফট প্রায়ই নষ্ট হয়, অথচ মাসে মাসে এত টাকা সার্ভিস চার্জ দিই। ব্যাপারটা কী?” আসলে, এই স্বচ্ছতা না থাকলে কিন্তু সন্দেহ থেকেই যায়। আবাসন সংস্থাগুলো এখন চেষ্টা করছে এই বিষয়গুলোকে আরও পরিষ্কার করতে, যাতে ফ্ল্যাট মালিকরা জানতে পারেন তাদের কষ্টার্জিত টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, যদি আপনি আপনার অ্যাপার্টমেন্টের মাসিক সার্ভিস চার্জের বিস্তারিত ব্রেকডাউন জানতে পারেন এবং নিয়মিত তা পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো ধরতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, আমার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে আমরা দেখেছি যে কিছু নির্দিষ্ট মেরামত কাজ নিয়মিতভাবে করানো গেলে বড় ধরনের ব্যয় হঠাৎ করে কমে আসে। মাসিক সার্ভিস চার্জের মধ্যে সাধারণত পানির বিল, লিফট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা কর্মীদের বেতন, সাধারণ এলাকার বিদ্যুৎ বিল, আবর্জনা অপসারণ এবং কমন এরিয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। অনেক সময় অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্ঘটনার জন্য একটি ডুবন্ত তহবিল (sinking fund) রাখা হয়, যা জরুরি অবস্থায় কাজে লাগে। তাই এই খরচগুলোকে শুধু বোঝা না ভেবে, আমাদের ফ্ল্যাট ও কমিউনিটির ভবিষ্যতের জন্য একটি জরুরি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
বিল্ডিংয়ের জরুরি মেরামত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
ভাবুন তো, হঠাৎ করে যদি আপনার ফ্ল্যাটের পাইপ ফেটে যায় বা ছাদ থেকে পানি পড়ে? তখন যে কী অবস্থা হয়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আমার নিজের একবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল, শীতের মধ্যে গভীর রাতে পাইপ ফেটে পুরো মেঝে পানিতে ভেসে গিয়েছিল! বিল্ডিংয়ের জরুরি মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা ভীষণ জরুরি। এই খরচগুলো সাধারণত মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচের বাইরে থাকে। যেমন, ছাদের জলরোধী ব্যবস্থা, ভবনের বাইরের অংশের রং করা বা বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত মেরামত। আমার পরামর্শ হলো, আবাসন সোসাইটির সাথে বসে প্রতি বছর বা দু’বছর অন্তর এই ধরনের কাজের জন্য একটি বাজেট তৈরি করা। এতে করে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করার চাপ কমে আসে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অ্যাপার্টমেন্টের আকার এবং প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে। এটি আপনার সম্পত্তির মূল্য এবং বসবাসের মানকেও প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা না থাকলে পরবর্তীতে ফ্ল্যাটের মূল্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই, একটি শক্তিশালী ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এক্ষেত্রে অপরিহার্য।
ট্যাক্সের বোঝা হালকা করার উপায়
ফ্ল্যাট নিবন্ধনে নতুন নিয়ম ও কর কাঠামো
ফ্ল্যাট কেনা বা বিক্রি করার সময় ট্যাক্সের ব্যাপারটা আমাদের সবচেয়ে বেশি ভোগায়। কী কী কর দিতে হবে, কোন নিয়মে দিতে হবে, তা নিয়ে অনেকেই ধোঁয়াশার মধ্যে থাকেন। সম্প্রতি সরকার এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ফ্ল্যাট ও প্লট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন নিয়ম এনেছে, যা সেবা সহজীকরণ এবং হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে। আগে ফ্ল্যাটের দলিল সম্পাদনের জন্য লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উত্তরাধিকার, ক্রয়, দান বা হেবা সূত্রে নামজারি এবং হস্তান্তর দলিল সম্পাদনের জন্য এখন আর এই অনুমোদনের দরকার হবে না। এটা আমার কাছে বিশাল একটা স্বস্তির খবর মনে হয়েছে! কারণ এই অনুমোদনের পেছনে অনেক সময় এবং অর্থের অপচয় হতো। তবে প্লটের বিভাজন বা একত্রীকরণ অথবা মাস্টারপ্ল্যানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্ল্যাট বা ভবনসহ ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের ২% এবং শুধু প্লট বা ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের ৩% হারে অর্থ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুকূলে জমা দিতে হবে। এটি নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) হিসেবে আদায় করা হবে। এছাড়াও, দলিল সম্পাদনের ৯০ দিনের মধ্যে দলিলের সার্টিফাইড কপি ও নামজারির রেকর্ডপত্র লিজদাতা প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জমা না দিলে দৈনিক ৫০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করতে সাহায্য করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
সম্পত্তি কর: আয়কর বিবরণীতে কী দেখাবেন?
আপনার ফ্ল্যাট বা জমি যদি আয়কর ফাইলে সঠিকভাবে দেখানো না থাকে, তাহলে কিন্তু বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে পারেন। অনেকেই ভাবেন, “আরে বাবা, এত জটিল নিয়ম কে মনে রাখে?” কিন্তু সত্যি বলতে, এই ছোট ভুলগুলোই পরে বিশাল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি জেল-জরিমানাও হতে পারে। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন কিন্তু আয়কর ফাইলে দেখাতে ভুলে গিয়েছিলেন। পরে যখন এনবিআর থেকে নোটিশ এলো, তখন তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী, ফ্ল্যাট বা জমি বিক্রির সময় প্রদেয় করকে চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, ফলে বিক্রেতাকে আর অতিরিক্ত কোনো কর দিতে হবে না। তবে, আপনার আয়কর ফাইলে ফ্ল্যাট বা বাড়ির সঠিক বিবরণ এবং বৈধ উৎস থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেমন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি হলে সম্পদ বিবরণীতে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে এবং মূল্য অজানা লিখতে হবে। যদি আপনি ঋণ বা দান গ্রহণ করে সম্পত্তি কেনেন, তাহলে নগদে ৫ লাখ টাকার বেশি না নেওয়া উচিত; এর বেশি হলে ক্রস চেকের মাধ্যমে লেনদেন করতে হবে, অন্যথায় পুরো টাকা আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ওপর আয়কর দিতে হবে। এসব ছোট ছোট বিষয়গুলো যদি আমরা একটু সচেতনভাবে মেনে চলি, তাহলে ট্যাক্সের বোঝা অনেকটাই হালকা করা সম্ভব। জমি বা ফ্ল্যাট কেনার সময় রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর এবং উৎসে আয়করের মতো বিভিন্ন কর প্রযোজ্য হয়। সিটি কর্পোরেশন এলাকার সম্পত্তির জন্য স্থানীয় সরকার কর ২%, অন্যান্য এলাকার জন্য ৩%। উৎসে কর (53H) এলাকাভেদে ২% থেকে ৬% পর্যন্ত হতে পারে। ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে নির্দিষ্ট হারে কর অথবা চুক্তিমূল্যের ৮%—এর মধ্যে যেটি বেশি, সেটি দিতে হয়। আপনার আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন তৈরি করার সময় যে বছরে সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রি করা হয়, সে বছরের প্রযোজ্য আইন জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ইউটিলিটি বিল: সাশ্রয়ের স্মার্ট কৌশল
বিদ্যুৎ বিল কমানোর সহজ উপায়
প্রতি মাসে বিদ্যুতের বিল হাতে পেলে আমার তো প্রায়ই চোখ কপালে ওঠে! বিশেষ করে গরমে এসি চালালে তো কথাই নেই। কিন্তু কিছু ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করে আর একটু সচেতন হলে কিন্তু এই বিলের বোঝা অনেকটাই কমানো সম্ভব। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন থেকে আমি এই টিপসগুলো ফলো করা শুরু করেছি, তখন থেকে বিলের অঙ্কটা বেশ খানিকটা কমে এসেছে। প্রথমেই বলি, দিনের বেলায় অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালানো বন্ধ করুন। প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়ান। যদি সম্ভব হয়, এলইডি বাতি ব্যবহার করুন, কারণ এগুলো সাধারণ বাল্বের চেয়ে অনেক কম বিদ্যুৎ খরচ করে। আমি আমার বাসার সব পুরোনো বাল্ব পাল্টে এলইডি লাগিয়েছি, আর সত্যি বলছি, এর ফল হাতেনাতে পেয়েছি। এসি ব্যবহার করার সময় তাপমাত্রা ২৬-২৭ ডিগ্রিতে রাখলে আরামও হবে, আবার বিলও কম আসবে। আর হ্যাঁ, ইনভার্টার এসি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। এছাড়া, ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো নিয়মিত সার্ভিসিং করা জরুরি। যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলে বিদ্যুৎ খরচ অনেক বেড়ে যায়। মোবাইল চার্জার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার না করলে প্লাগ খুলে রাখুন, কারণ স্ট্যান্ডবাই মোডেও কিন্তু বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো আপনার মাসিক বিলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পানি ও গ্যাস বিল নিয়ন্ত্রণ: অভ্যাসে বদল আনুন
বিদ্যুতের মতো পানি ও গ্যাসের বিলও আমাদের মাসিক খরচের একটা বড় অংশ কেড়ে নেয়। এসব বিল কমানোও কিন্তু খুব কঠিন কাজ নয়, যদি আমরা একটু বুদ্ধি খাটিয়ে চলি। আমি নিজে দেখেছি, অযথা পানির অপচয় করলে মাস শেষে বিলটা আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ব্রাশ করার সময় বা থালা-বাসন ধোয়ার সময় কলের মুখ বন্ধ রাখা, ওয়াটার হিটারের ব্যবহার কমিয়ে আনা – এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো কিন্তু অনেক পার্থক্য তৈরি করে। আমার ফ্ল্যাটের ওয়াটার হিটারের তাপমাত্রা আমি একটু কমিয়ে রেখেছি, আর এর ফলে সত্যিই বিল কমেছে। গ্যাস বিলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রান্নার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে চুলার মুখ বন্ধ করে দিন। দীর্ঘক্ষণ ধরে অল্প আঁচে রান্না করার চেয়ে মাঝারি আঁচে দ্রুত রান্না সেরে ফেললে গ্যাস সাশ্রয় হয়। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসবান্নার পরিবর্তন করে নতুন এবং আধুনিক গ্যাসের চুলা ব্যবহার করলে গ্যাসের অপচয় রোধ করা যায়। আমি আমার ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের পুরোনো গ্যাস বার্নার বদলে ফেলেছি এবং দেখেছি যে, এর ফলে গ্যাসের খরচ বেশ কমে এসেছে। অনেক সময় দেখা যায়, গ্যাস লাইনে কোনো লিক থাকলে বা ত্রুটিপূর্ণ পাইপ থাকলেও গ্যাস অপচয় হয়, যা আমাদের বিল বাড়িয়ে তোলে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে কোনো লিক নেই। কমিউনিটি লিভিংয়ে অনেক সময় কমন এরিয়ার পানির বিল বা গ্যাসের বিল আমাদের মাসিক সার্ভিস চার্জের সাথে যুক্ত থাকে। সে ক্ষেত্রে সোসাইটির পক্ষ থেকে একটি সামগ্রিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে, যাতে সবাই সাশ্রয়ী হতে উৎসাহিত হয়।
ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে আপনার অধিকার ও দায়িত্ব
আবাসন সোসাইটির ভূমিকা ও স্বচ্ছতা
আবাসন সোসাইটি বা ম্যানেজমেন্ট কমিটি আমাদের ফ্ল্যাট জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু অনেক সময় আমরা জানি না যে সোসাইটির প্রতি আমাদের কী দায়িত্ব, আর তাদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি। আমার মনে আছে, একবার আমাদের সোসাইটিতে একটা বড় ধরনের মেরামতের দরকার হয়েছিল, কিন্তু ফান্ড নিয়ে একটা বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন আমরা সবাই মিলে বসেছিলাম এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, প্রতি তিন মাস অন্তর একটা আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, যেখানে সব আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকবে। এর ফলে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং সবার মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে। আবাসন সোসাইটির প্রধান কাজ হলো ভবনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, সাধারণ এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং সব ফ্ল্যাট মালিকের স্বার্থ রক্ষা করা। তাদের উচিত নিয়মিত মিটিং করা, যেখানে ফ্ল্যাট মালিকরা তাদের মতামত ও অভিযোগ জানাতে পারেন। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, লিফট ও জেনারেটরের সুষ্ঠু পরিচালনা—এসব বিষয়ে সোসাইটির সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ আবাসন সোসাইটি ফ্ল্যাট মালিকদের অনেক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সোসাইটির পক্ষ থেকে নতুন নীতিমালার ব্যাপারেও সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত, যেমন সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনাগুলো।
বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইনি পরামর্শ
ফ্ল্যাট জীবনে অনেক সময় প্রতিবেশী বা সোসাইটির সাথে নানা বিষয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। ধরুন, আমার এক বন্ধু তার ফ্ল্যাটে কিছু সংস্কার কাজ করাতে চেয়েছিল, কিন্তু সোসাইটি থেকে অনুমতি পাচ্ছিল না, কারণ তাদের মতে কাজটি বিল্ডিংয়ের কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন, তা জানা খুব জরুরি। ছোটখাটো বিরোধ সাধারণত আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব, কিন্তু যখন সমস্যা বড় আকার ধারণ করে, তখন আইনি পরামর্শ নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন, যদি আপনার মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকে বা আপনার ফ্ল্যাট পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে কিন্তু নতুন নিয়মের আওতায়ও লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এছাড়া, আয়কর সম্পর্কিত কোনো জটিলতা দেখা দিলে একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা দেখা যায়, এবং প্রকৃত মূল্য ও দলিল মূল্যের মধ্যে পার্থক্যও থাকে। এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, আয়কর আইন এবং রীতিনীতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা দরকার। এসব ক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও পরামর্শের জন্য অভিজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, সঠিক তথ্য আর আইনি সহায়তা আপনার অধিকার রক্ষা করতে সাহায্য করবে এবং আপনাকে অহেতুক হয়রানি থেকে বাঁচাবে।
আবাসন খাতে সরকারি সহায়তা ও নতুন সুযোগ

সরকারের নতুন নির্দেশনা: কী আছে আপনার জন্য?
সরকার এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আবাসন খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা আমাদের মতো ফ্ল্যাট মালিকদের জন্য অনেক নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আমি সত্যি বলতে, এই খবরগুলো যখন শুনলাম, তখন মনে হলো আমাদের অনেক দিনের দাবি বুঝি এবার পূরণ হতে চলেছে। বিশেষ করে, আবাসিক প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রথা বাতিল করা হয়েছে। আগে এই অনুমোদনের জন্য কত যে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো, তার ইয়ত্তা নেই! এখন উত্তরাধিকার, ক্রয়, দান বা হেবা সূত্রে নামজারি, হস্তান্তর দলিল সম্পাদন বা বাতিল, আম-মোক্তার দলিল সম্পাদন বা বাতিল এবং ঋণ গ্রহণের অনুমতির জন্য এই অনুমোদনের আর প্রয়োজন হবে না। তবে, প্লটের বিভাজন বা একত্রীকরণ এবং মাস্টারপ্ল্যানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম বহাল থাকবে। এটি দুর্নীতি ও হয়রানি কমানোর জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ফ্ল্যাট বা ভবনসহ ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের ২% এবং শুধু প্লট বা ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের ৩% হারে অর্থ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। এছাড়া, দলিল সম্পাদনের ৯০ দিনের মধ্যে দলিলের সার্টিফাইড কপি এবং নামজারির রেকর্ডপত্র লিজদাতা প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেরিতে জমা দিলে জরিমানা হতে পারে। এই নির্দেশনাগুলো আমাদের ফ্ল্যাট কেনা-বেচার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং ভোগান্তিমুক্ত করবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আবাসন ঋণ ও সরকারি ব্যাংকের সুযোগ
ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবছেন? তাহলে নিশ্চয়ই আবাসন ঋণের কথা মাথায় এসেছে। সরকারি ব্যাংকগুলো এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন (BHBFC) ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। আমি নিজে দেখেছি, অনেকেই বেসরকারি ব্যাংকের চড়া সুদের হার দেখে পিছিয়ে যান, কিন্তু সরকারি সুযোগগুলো সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। এই কর্পোরেশন ফ্ল্যাট কিনতে বা বাড়ি নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদান করে, যা তুলনামূলকভাবে কম সুদে পাওয়া যায়। ঋণের পরিমাণ, সুদের হার এবং পরিশোধের সময়কাল বিভিন্ন স্কিমের উপর নির্ভর করে। আমার মনে হয়, যারা প্রথমবার ফ্ল্যাট কিনছেন বা পুরোনো ফ্ল্যাট সংস্কার করতে চান, তাদের এই সরকারি সুযোগগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। ঋণ নেওয়ার আগে অবশ্যই সমস্ত নিয়মাবলী, সুদের হার এবং অতিরিক্ত ফি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেবেন। সঠিক পরিকল্পনা আর সরকারি সহায়তায় আপনার স্বপ্নের ফ্ল্যাট কেনা এখন আর অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের আবাসন খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং এই খাতে বিনিয়োগ লাভজনক হতে পারে। সঠিক তথ্যের জন্য, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট বা তাদের শাখা অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। তারা আপনাকে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবে।
পরিবেশবান্ধব ফ্ল্যাট: খরচ কম, জীবন সুন্দর
স্মার্ট হোম প্রযুক্তি ও জ্বালানি সাশ্রয়
আজকাল স্মার্ট হোম প্রযুক্তির কথা প্রায়ই শোনা যায়, আর আমিও এর বড় একজন ভক্ত। ভাবুন তো, আপনার ফ্ল্যাট যদি নিজেই বিদ্যুৎ আর পানি সাশ্রয় করতে পারত! এটা শুধু কল্পনাই নয়, এখন বাস্তবে সম্ভব। আমার ফ্ল্যাটে আমি কিছু স্মার্ট ডিভাইস লাগিয়েছি, যেমন স্মার্ট লাইটিং, যা দিনের আলোর তীব্রতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো নিয়ন্ত্রণ করে। এতে বিদ্যুৎ বিল বেশ কমেছে। এছাড়াও, স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট এসির তাপমাত্রা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে ঘর ঠান্ডা থাকে অথচ বিদ্যুতের অপচয় না হয়। ইনভার্টার এসি বা রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, যা আমি আগেও বলেছি। এলইডি বাল্ব তো এখন প্রায় সবার বাসাতেই চলে এসেছে, কারণ এগুলো অনেক বেশি সাশ্রয়ী। এগুলো পরিবেশের জন্যও ভালো। এমন সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা শুধু বিলই কমাই না, পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখি। আমার মনে হয়, প্রাথমিকভাবে একটু বেশি খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগটা কিন্তু বেশ লাভজনক।
সৌর শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার
বিদ্যুৎ বিল কমানোর আরেকটি অসাধারণ উপায় হলো সৌর শক্তি বা সোলার প্যানেলের ব্যবহার। বিশেষ করে যারা নিজের বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল লাগাতে পারেন, তাদের জন্য এটি দারুণ একটা সুযোগ। আমার এক বন্ধু তার ফ্ল্যাটে সোলার প্যানেল লাগানোর পর থেকে তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে! এটা শুধু অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী নয়, পরিবেশের জন্যও খুব ভালো। এছাড়া, ফ্ল্যাট তৈরির সময় যদি প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা যায়, তাহলে দিনের বেলায় লাইট বা ফ্যান কম ব্যবহার করা যায়, এতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। পশ্চিম দিকে রান্নাঘর এবং দক্ষিণ দিকে শোবার ঘর রাখলে ঘরে আলো-বাতাস বেশি প্রবেশ করে। রঙিন কাচের পরিবর্তে স্বচ্ছ কাচ ব্যবহার করলে ঘর প্রাকৃতিকভাবে আলোকিত থাকে। এই ধরনের ছোট ছোট ডিজাইন পরিবর্তনও কিন্তু পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের নিজেদের ফ্ল্যাটে আমি চেষ্টা করি দিনের বেলায় জানালা খোলা রেখে প্রাকৃতিক বাতাস ব্যবহার করতে, এতে এসি বা ফ্যানের উপর চাপ কমে। এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করে আমরা শুধু নিজের পকেটের দিকে তাকাই না, বরং পৃথিবীর প্রতিও আমাদের দায়িত্ব পালন করি।
ফ্ল্যাটের মালিকদের জন্য কিছু জরুরি টিপস
আর্থিক বাজেট ও সঞ্চয়
ফ্ল্যাটের খরচ সামলানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সঠিক আর্থিক বাজেট তৈরি করা। আমার অভিজ্ঞতা বলে, মাসের শুরুতে যদি আপনি আপনার সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের একটা হিসাব কষে রাখেন, তাহলে অপ্রত্যাশিত খরচগুলো সামলানো সহজ হয়। আমি নিজে প্রতি মাসের শুরুতে একটা ছোট খাতা নিয়ে বসে পড়ি, যেখানে আমার মাসিক আয়, সার্ভিস চার্জ, ইউটিলিটি বিল, আর অন্যান্য সম্ভাব্য খরচগুলো লিখে রাখি। এতে মাস শেষে হিসাব মেলাতে অনেক সুবিধা হয়। ফ্ল্যাট রক্ষণাবেক্ষণের খরচের সঠিক হিসাব রাখা খুবই জরুরি। মাসিক বা বার্ষিক খরচের হিসাব রাখুন এবং কোথায় কত খরচ হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করুন। এতে আপনি আপনার বাজেট এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা সহজেই করতে পারবেন। এছাড়া, ভবিষ্যতের বড় মেরামতের জন্য একটি সঞ্চয় তহবিল রাখাটাও বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন ধরুন, ১০ বছর পর হয়তো বিল্ডিংয়ের ছাদ বা বাইরের অংশে বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের খরচের জন্য আগে থেকে যদি আমরা অল্প অল্প করে সঞ্চয় করি, তাহলে হঠাৎ করে বিশাল অঙ্কের টাকার চাপ সামলানো সহজ হয়। আবাসন সোসাইটির সাথে আলোচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করুন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হলে তা দ্রুত সমাধান করা যায়।
আইনি অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা
ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে আমাদের শুধু কিছু দায়িত্বই থাকে না, কিছু আইনি অধিকারও থাকে। এই অধিকারগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকাটা ভীষণ জরুরি। আমার মনে আছে, একবার আমাদের সোসাইটিতে একটা নতুন নিয়ম চালু করার চেষ্টা হয়েছিল, যা আমার মনে হয়েছিল আমাদের অধিকারের পরিপন্থী। তখন আমি কয়েকজন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে আমার অধিকার সম্পর্কে জেনেছিলাম এবং সোসাইটিকে আমার মতামত জানিয়েছিলাম। আবাসন আইনের পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত নতুন সরকারি প্রজ্ঞাপনগুলো সম্পর্কেও আমাদের ওয়াকিবহাল থাকা উচিত। লিজ দলিলের মেয়াদ শেষে (৯৯ বছর পর) তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নকৃত বলে গণ্য হবে এবং হস্তান্তর ফি আদায়ও রহিত হয়ে যাবে। তবে লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া প্লটের বিভাজন বা একত্রীকরণ, প্লট বা ফ্ল্যাটের ব্যবহার শ্রেণির পরিবর্তনসহ মাস্টার প্ল্যানের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর এবং উৎসে আয়করের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে। এই তথ্যগুলো জানা থাকলে আমরা নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারব এবং কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে পারব। নিজেরা সচেতন হলে আর সঠিক তথ্য জানা থাকলে ফ্ল্যাট জীবনে অপ্রত্যাশিত সমস্যাগুলো অনেক সহজে সমাধান করা যায়।
|
খরচের ধরন |
সাধারণত অন্তর্ভুক্ত বিষয় |
সাশ্রয়ের উপায় |
|---|---|---|
|
মাসিক সার্ভিস চার্জ |
লিফট, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, কমন এরিয়া বিদ্যুৎ, পানি |
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত নিরীক্ষা করা |
|
বিদ্যুৎ বিল |
আলো, পাখা, এসি, ফ্রিজ |
এলইডি ব্যবহার, ইনভার্টার যন্ত্র, প্লাগ খুলে রাখা, দিনের আলো ব্যবহার |
|
পানি ও গ্যাস বিল |
রান্না, গোসল, অন্যান্য ব্যবহার |
সচেতন ব্যবহার, লিক চেক করা, পুরনো বার্নার পরিবর্তন |
|
ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি |
দলিল মূল্য, স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর |
নতুন সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, আইনি পরামর্শ গ্রহণ |
|
সম্পত্তি কর |
আয়কর ফাইল, মূলধনি আয় |
আয়কর বিবরণীতে সঠিক তথ্য, বৈধ উৎস, আইনজীবীর পরামর্শ |
|
জরুরি মেরামত |
কাঠামোগত ত্রুটি, ছাদের মেরামত |
দীর্ঘমেয়াদী বাজেট, সোসাইটির সাথে আলোচনা |
글을মাচি며
সত্যি বলতে কী, ফ্ল্যাটের জীবনটা অনেক আনন্দ আর স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু এই স্বাচ্ছন্দ্যকে ধরে রাখতে হলে আমাদের একটু সচেতন এবং বিচক্ষণ হতে হয়। আমি আজ আপনাদের সাথে আমার নিজের অভিজ্ঞতা আর সাম্প্রতিক তথ্যগুলো শেয়ার করলাম, যাতে আপনাদের ফ্ল্যাটের খরচ কমানো এবং ট্যাক্সের বোঝা হালকা করার পথটা আরও পরিষ্কার হয়। আমার বিশ্বাস, এই ছোট ছোট টিপস আর কৌশলগুলো যদি আমরা একটু মনোযোগ দিয়ে মেনে চলি, তাহলে মাস শেষে পকেটের চাপ যেমন কমবে, তেমনই ফ্ল্যাট জীবনটা হয়ে উঠবে আরও শান্তিপূর্ণ ও ঝামেলামুক্ত। মনে রাখবেন, প্রতিটি পদক্ষেপই আপনাকে একটি টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে স্মার্ট ফ্ল্যাট জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
알아두লে 쓸মো 있는 정보
1. আপনার ফ্ল্যাটের মাসিক সার্ভিস চার্জের প্রতিটি খাতের বিস্তারিত হিসাব জানতে চান এবং নিয়মিত তা পর্যালোচনা করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো খুঁজে বের করা সহজ হবে।
2. বিদ্যুৎ বিল কমাতে অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালানো বন্ধ করুন, এলইডি বাল্ব ব্যবহার করুন এবং এসি ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখুন। ইনভার্টার প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারে জোর দিন।
3. পানি ও গ্যাস অপচয় রোধ করতে সচেতন হন। ব্রাশ করার সময় বা থালা-বাসন ধোয়ার সময় কল বন্ধ রাখুন এবং রান্নার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে চুলার মুখ বন্ধ করে দিন।
4. ফ্ল্যাট নিবন্ধন ও ট্যাক্স সংক্রান্ত নতুন সরকারি নিয়মকানুন সম্পর্কে সব সময় অবগত থাকুন। কোনো জটিলতা দেখা দিলে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা আয়কর উপদেষ্টার পরামর্শ নিন।
5. আবাসন সোসাইটির মিটিংগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করুন এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি মেরামতের জন্য একটি সঞ্চয় তহবিল গঠনে উৎসাহিত করুন।
중য় 사항 정리
আমাদের ফ্ল্যাট জীবনের আর্থিক দিকটা সামলানো প্রথম দিকে একটু চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে, কিন্তু সঠিক জ্ঞান আর একটু সচেতনতা থাকলে তা বেশ সহজ হয়ে যায়। আজকের আলোচনায় আমরা দেখেছি, কিভাবে ফ্ল্যাটের মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিল কমানো যায়। সরকারি নতুন নীতিমালাগুলো আমাদের ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং ট্যাক্স পরিশোধের প্রক্রিয়াকে আরও সরল করেছে, যা আমাদের জন্য বিশাল একটি স্বস্তির খবর। বিশেষ করে, উত্তরাধিকার, ক্রয় বা হেবা সূত্রে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল হওয়ায় অনেক ভোগান্তি কমেছে। এছাড়া, আয়কর বিবরণীতে ফ্ল্যাট বা সম্পত্তির সঠিক তথ্য উল্লেখ করা এবং উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকাটা খুবই জরুরি, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে। স্মার্ট হোম প্রযুক্তি এবং সৌর শক্তির মতো পরিবেশবান্ধব উপায়গুলো শুধু বিলই কমায় না, বরং আমাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত করে। মনে রাখবেন, একটি সুচিন্তিত বাজেট, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আবাসন সোসাইটির সাথে কার্যকরী যোগাযোগ আপনার ফ্ল্যাট জীবনকে আরও সহজ ও আনন্দময় করে তুলতে পারে। নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যা অপ্রত্যাশিত সমস্যা মোকাবিলায় আপনাকে প্রস্তুত রাখবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: সাধারণত একটি ফ্ল্যাটের মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কোন কোন খাতে যায় এবং এর পরিমাণ কেমন হতে পারে?
উ: আরে বাবা, এই প্রশ্নটা তো আমারও মাথায় ঘুরপাক খেত যখন আমি প্রথম ফ্ল্যাট কিনেছিলাম! সত্যি বলতে কি, আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট কেনা যেমন একটা বিরাট স্বপ্ন, তেমনি তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচগুলোও অনেক সময় ঘুম হারাম করে দেয়। তবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই খরচগুলো কিন্তু মূলত কয়েকটা নির্দিষ্ট খাতেই যায়। যেমন ধরুন, প্রথমেই আসে বিল্ডিংয়ের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ। এর মধ্যে লিফট সার্ভিসিং, জেনারেটর সার্ভিসিং, সিঁড়িঘর আর করিডোরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাগান থাকলে তার দেখভাল – এই সবকিছুই যুক্ত থাকে। এছাড়াও থাকে নিরাপত্তা কর্মীদের বেতন, আবর্জনা অপসারণের খরচ, আর সাধারণ বিদ্যুৎ ও পানির বিল। অনেক সময় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক ফি নির্ধারণ করে দেয়, যেটা সাধারণত ফ্ল্যাটের আকার আর সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে। আমার পাশের বাড়ির বন্ধুর ফ্ল্যাট একটু বড়, তার খরচটা আমার থেকে সামান্য বেশি। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, ছোট ফ্ল্যাটের জন্য মাসিক ২০০০-৫০০০ টাকা এবং বড় ফ্ল্যাটের জন্য ৫০০০-১৫০০০ টাকা পর্যন্ত এই খাতে খরচ হতে পারে। এই টাকাগুলো যখন আমরা নিয়মিত দেই, তখন আসলে বিল্ডিংয়ের কাঠামো ঠিক থাকে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, আর আমাদের জীবনযাত্রাও মসৃণ হয়। বিশ্বাস করুন, এই খরচটা একটা বিনিয়োগের মতোই!
প্র: ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোর জন্য আমার মতো সাধারণ মানুষ কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
উ: হুম, এই তো আসল প্রশ্ন! সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেও এই বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি আর কিছু কার্যকরী উপায় বের করেছি। আমার নিজের ফ্ল্যাটের খরচ কমানোর জন্য আমিও কিছু কৌশল অবলম্বন করেছি, আর সেগুলো বেশ কাজে দিয়েছে। প্রথমত, ফ্ল্যাট মালিক সমিতির মিটিংগুলোতে নিয়মিত অংশ নিন। সেখানে আপনার মতামত দিন এবং স্বচ্ছতার জন্য জোর দিন। আমি দেখেছি, যখন সবাই মিলে আলোচনা করে, তখন অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হোন। অপ্রয়োজনে লাইট জ্বালানো বা ট্যাপ খোলা রাখবেন না। পুরনো ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম পরিবর্তন করে এনার্জি-সেভিং সরঞ্জাম ব্যবহার করুন। আমার নিজের বাড়িতে এলইডি লাইট লাগানোর পর থেকে বিদ্যুতের বিল অনেকটাই কমে এসেছে, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় সার্ভিসগুলো বাদ দিতে অনুরোধ করতে পারেন, যদি দেখেন সেগুলো খুব একটা কাজে আসছে না। অনেক সময় সমিতির পক্ষ থেকে এমন কিছু সার্ভিস রাখা হয়, যার প্রয়োজন হয় না। সবশেষে, বিভিন্ন সরবরাহকারী সংস্থার সাথে চুক্তি করার সময় ভালো করে যাচাই করুন। একসঙ্গে কয়েকটা কোটেশন নিন এবং সবচেয়ে ভালো সার্ভিস ও কম মূল্যের অফারটি বেছে নিন। আমি নিজে কয়েকবার এভাবে করে দেখেছি, বেশ খানিকটা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়!
প্র: ফ্ল্যাটের মালিকানা সংক্রান্ত সরকার নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ ট্যাক্সগুলো কী কী এবং সেগুলো পরিশোধের প্রক্রিয়া কেমন?
উ: ওহ, ট্যাক্সের কথা উঠলেই অনেকের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়, তাই না? আমিও প্রথমদিকে একটু ভয় পেতাম, কারণ ট্যাক্সের বিষয়টা বেশ জটিল মনে হতো। কিন্তু একবার যখন বুঝে গেলাম, তখন দেখলাম ব্যাপারটা মোটেই ততটা কঠিন নয়। ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে আমাদের কিছু সরকারি ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো হোল্ডিং ট্যাক্স (Holding Tax) বা পৌরকর। এটা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার পক্ষ থেকে আদায় করা হয় এবং ফ্ল্যাটের অবস্থান ও আকারের ওপর ভিত্তি করে এর পরিমাণ নির্ধারিত হয়। আমার পরিচিত অনেকেই এই ট্যাক্স নিয়ে প্রথমে দ্বিধায় ভুগেছেন, কিন্তু এর পরিশোধ প্রক্রিয়া বেশ সহজ। সাধারণত স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা অফিসে গিয়ে অথবা তাদের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে এই ট্যাক্স পরিশোধ করা যায়। এছাড়া, ফ্ল্যাট কেনা-বেচার সময় রেজিস্ট্রি ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, ভ্যাট (VAT) এবং গেইন ট্যাক্স (Gain Tax) বা উৎস করের মতো আরও কিছু ট্যাক্স যুক্ত থাকে। এগুলো সাধারণত ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের সময় এককালীন পরিশোধ করতে হয়। আপনি যদি নতুন ফ্ল্যাট কেনেন, ডেভেলপার কোম্পানি সাধারণত এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করবে। সম্প্রতি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ফ্ল্যাট হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যেখানে নামজারি, দলিল সম্পাদন বা হস্তান্তর করতে আর লিজদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগবে না, তবে দলিল মূল্যের ২% হস্তান্তর ফি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলে, ট্যাক্স পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলা খুব জরুরি, নাহলে জরিমানা লাগতে পারে। অনলাইনে এখন অনেক তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলো যাচাই করে নিলে আপনার জন্য আরও সুবিধা হবে। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে ট্যাক্স পরিশোধ করা একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য!






